স্টেশন (ধারাবাহিক উপন্যাস ১ম পর্ব)
দুপুর এর লোকাল ট্রেন টি আধা ঘন্টা লেট করে এই মাত্র
আসল। জ্যৈষ্ঠের দুপুর। সূর্যের তাপে সব কিছু জেন তেঁতে আছে। ছোট্ট শহরটির
সবখানেই দুপুরের খাবার এর পর আলসেমো একটা আমেজ। দোকানি রা টেবিলে মাথা রেখে
ঝাপ গুলো আধখোলা করে ঝিমিয়ে নিচ্ছে। কেউ বা বেঞ্চে শুয়ে দিবানিদ্রায়
ব্যাস্ত । সেই আমেজ যেন ট্রেনেও লেগে আছে। বড় হুইসেল দিয়ে ধাতব চাকা গুলো
শব্দ করে স্টেশনে এসে থামে। এ ট্রেন টি সান্তাহার থেকে ছেড়ে লালমনিরহাট
পর্যন্ত যায়। ঈদ বা পুজ ছাড়া এ ট্রেনটি এই সময়ে প্রায় খালিই থাকে। স্টেশনেও
যাত্রী বিশেষ কেউ নেই। দুজন কুলি তাদের লাল জামা টি কাঁধে ফেলে ইতিউতি
তাকাচ্ছে আর ঘারে গামছা দিয়ে অনবরত মুখের ঘাম মুছছে । তবে বোঝা না পেয়ে যে
তারা খুব চিন্তিত তা মনে হচ্ছে না। তাদের চোখেও ঘুম ঘুম ভাব স্পষ্ট। হাই
তুলতে তুলতে কাস্টমার না পেয়ে প্লাটফর্ম ধরে ট্রেনের পেছনের দিকে যেতে থাকে
তারা।
প্লাটফর্ম আসলে নামেই, প্লাটফর্ম বলতে যা বুঝায় তা নেই এ স্টেশনে। চার দিকে উন্নয়নের জয় জয় কারে কেন প্লাটফর্ম নেই তা কেউ জানে না। স্টেশনের উত্তর পাশে দুট বস্তা নিয়ে জাম গাছের নিচে বসে ছিল এক বুড়ি। একটু কুঁজো হয়ে গেছে তবে একসময় বেশ লম্বা ছিল বোঝা যায়। গায়ে জড়ান কালো পারের নীল মোটা কাপড়ের এক টা শাড়ি। সে নীলও রোদ জ্বলা হয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। সাধারনত এগুলো মানুষ এখন জাকাতের শাড়ি হিসেবে দেয়। বুড়ির শুকনো শরীরেও সে শাড়ি ঠিক মত হয় নি, তাই বার বার আচল টেনে মাথার কাছে নিয়ে আসলেও তা থাকছে না। পায়ের দিকে উঁচু করে পরা না শাড়ির ঘের ছোট তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। মুখটি লম্বাটে, উঁচু নাক, মুখের চামরা গুলো যেন অসঙ্খ্য ভাজ হয়ে মুখে র সাথে বসে যেতে চাইছে। চোখের পাতা দুটি পানিতে ভেজা মাঝে মাঝে শাড়ির আচল দিয়ে সেটা মুছছে। কাঁদছে না, চালসে ধরেছে চোখে তাই পানি পরে। হয়ত কম দেখে চোখে কিন্তু মনে হয় সে এ কম দৃষ্টিতেই অভিযোজিত হয়ে গেছে। এ বয়সেও যাকে বোঝা টানতে হচ্ছে, তার চোখে কান্নার অশ্রু না চালসের অশ্রু তা বোঝার আর কি দরকার?
যে নিজেই প্রায় অচল তার সাথে এ দুট বস্তা কেন তা ভাবার বিষয়। টানতে টানতে বস্তা দুটি কে টেনের কামরার সামনে আনতে পেরেছে কোন মত। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলছে “ ও বাবা বস্তা ডা অ্যানা তুলে দেও বাবা”। দরজায় কেউ নেই। একজন বাদাম ওয়ালা শুধু তাড়াহুড়ো করে নেমে আর এক বগির দিকে এগিয়ে গেল। বুড়ি ডেকেই যাচ্ছে। দরজার পাশের সিট টাতে এক জন পা তুলে ঘুমাচ্ছিল। বুড়ির হাক শুনে না গরমে একবার জানালা দিয়ে মাথা বের করে তাকিয়ে আবার সরিয়ে নিল। কুলি দুটি বুড়ির প্রায় কাছে আসতেই তার হাক শুনতে পেল। তখনই ট্রেন ছাড়ার জন্য গার্ড এর হুইসেল শোনা গেল। কুলি টি কাছে গিয়ে বলল, “ কেডা জলিলের মাও না”? বুড়ি সে উত্তর না দিয়ে ব্যাকুল হয়ে শুধু বলল “ হামার বস্তা ডা তুলে দেও বাবা”। এক কুলি তাকে জিজ্ঞেস করার সময় আর একজন একটা বস্তা তুলে দিয়েছে। বুড়ির হাত ধরে কোনমত তারা তাকে বগির ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। এরপর আর একটি বস্তা টা তুলে দেয় বুড়ির পাশে। এগুলো করার সময় বলতে থাকে “তোমাক এগ্লা টানবের বায়না কেডা দিছে? নিজেই অচল তার সাথে বোচকা বাচকি”।বুড়ি বলে সাধে কি হামি এগ্লা টানি রে? আল্লাহক কই মরন দেও, তাও ত দেয় না”। ততক্ষনে ট্রেন চলতে শুরু করেছে। বুড়ি বস্তা টা ধরে কুলি দুটিকে দেখার চেষ্টা করতে থাকে আর বলতে থাকে “আল্লাহ তোগেরে ভালো করবি বাবা”। কুলি দুটি হাত ঝারতে ঝারতে বলে “বুড়ির এক পাও কব্বরে ঢুকে আছে তাও বুড়ি বস্তা টানা ছাড়ে না”। আর এক জন একটু আক্ষেপ করে বলে “কি করবি ক, এডা ব্যাটা তাও পাগলা। কুটি থাকে না থাকে ঠিক নাই। বুড়িক আর কেডা দেখবি”?
ট্রেন টি চলে যাওয়ার সাথে সাথে নিস্তব্ধতা নেমে আসে স্টেশনে। পশ্চিম দিকে মুখ করা স্টেশন এর লাল ইট এর দালান। তার পাশেই শক্ত মোটা টিনের বেশ উঁচু একটা সেড। সেখানে যাত্রীদের বসার যায়গা, এক কোনায় পান সিগারেট এর একটি দোকান। প্লাটফর্ম এর সাথেই একটি চা স্টল। স্টলটির পেছনের দিকে একটি উঁচু ঘটের চুলোয় বড় বড় তিনটি কেটলি চরান। একটি তে পানি ফুটছে আর একটি তে চা পাতা। শেষের টি তে দুধ। দুধ জাল হতে হতে ঘন লাল হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে সেখান থেকে স্বর তুলে ছোট ছোট গ্লাসে ভরে রাখে দোকানি ইসমাইল মিয়াঁ। আর দোকানে কাঠের সরু টেবিল কে ঘিরে অনেক গুলো কাঁচের কৌটো, তাতে না না পদের বিস্কিট, কেক রাখা। পাশে দাড় করান প্লাস্টিকের কেসে কিছু কোমল পানীয়।
স্টেশন ঘরে একটি মাত্র কামরা, ভেতরে একটি টয়লেট আছে। নোনা ধরা সাদা দেয়ালের এক পাশে অনেক উঁচুতে একটি বড় গোল দেয়াল ঘড়ি ঝুলান, আর নিচে সারি করা অনেক গুলো ক্যালেন্ডার। সব গুলিতেই ট্রেন এর ছবি। পুরোন ক্যালেন্ডার গুলি সরান কেন হয় নি কে জানে? ঘরটিতে বড় একটি টেবিল পাতা। টেবিল এর বয়স কত তা একটা গবেষনার বিষয় হতে পারে। শক্ত কাল কাঠের তৈরি। টেবিলে দুটি কালো রঙ এর টেলিফোন সেট। তার একদিকে দুটি কাঠের চেয়ার। টেবিলের উপর বড় একটি খাতা। এতে ট্রেন আসা যাওয়া আর নির্দিষ্ট পন্য ওঠানামার রেকর্ড করা হয়। চেয়ার এর পেছনে জানালা ঘেঁষে একটি আলমারি। টিকেট রাখার জন্য বিশষ ভাবে তৈরি। পাল্লা দুটি খুললে ভেতর থেকে অসঙ্খ্য খোপ খোপ টিকিট রাখার যায়গা গুলো উকি দেয়।
দেড় ইঞ্চি বাই দুই ইঞ্চি আকৃতির মোটা কাগজের টিকেট। কোন টির রঙ ফ্যাসফেসে হলুদ কোনটি বা জ্বলে যাওয়া লাল। এর উপর বাংলাদেশ রেল ওয়ের মনোগ্রাম সহ আরো কিছু লেখা থাকে। কোন স্টেশন থেকে কোন স্টেশন যাবে তা, দূরত্ব এই সব। পিছনে লেখা থাকে কোন একটি জন সচেতনতা মূলক স্লোগান। যেমন “ছেলে হোক মেয়ে হোক দুটি সন্তানি যথেষ্ট” এ রকম আরো কিছু। টিকেট টি একটি লোহার অদ্ভুত যন্ত্রের মাঝে ঢুকিয়ে দিলে কটাস করে একটি ধাতব শব্দ হয়। আর এতে ঐ দিনের তারিখ টিকেটে লেগে যায়। ”আরো খবর জানতে “
এর পাশেই একটি ওজন যন্ত্র। কোন এক সময় হয়ত পন্য ওজন ওজন করা হত। এর বিশাল ওজন নির্দেশক গোলক টি র কাটা কত বছর ধরে ১০০ পাউন্ড এ থেমে আছে তা কেউ বলতে পারে না। ব্রিটিশ রা রেল চালু করেছিল এ উপমহাদেশে, তাই বোধ হয় ওদের একক ব্যাবহার করেছে। এর পাশে লোহার বাক্সের মত একটি অদ্ভুত যন্ত্র। যখন কোন ট্রেনের খবর হয় তখন তার দিকের সাথে মিলিয়ে এই যন্ত্রের সেই পাশের হ্যান্ডেল টিতে চাপ দিয়ে ঘুরিয়ে দেয়। ভেতরে হাতুরি পেটার মত শব্দ করে এক টি পিতলের চাকতি বেরিয়ে আসে। সেখানে ট্রেন এর পরিচিতি নির্দেশক কিছু একটা থাকে। সেটা কে একটা গোলাকার প্রায় দেড় ফুট ব্যাসার্ধের একটি গোলকে র সাথে ভাল করে জরিয়ে দেয়া হয়। ট্রেন আসলে সেটা কে ট্রেন এর গার্ড এর কাছে দেয়া হয় আর গার্ড এর কাছ থেকে অন্য স্টেশনে দেয়া গোলকটি নেয়া হয়। ছোট্ট স্টেশনে এক্সপ্রেস ট্রেন গুলি থামে না। সেগুলি কে এ চাকতি দেয়া হয় একটি বিশেষ উপায়ে। সিগ্নাল ম্যান স্টেশন এর আউট সিগ্নালের কাছাকাছি গিয়ে একটি লোহার বড় তারের মাথায় কাপড় পেচিয়ে কেরসিন ঢেলে আগুনের মশাল তৈরি করে। ট্রেন যখন দৃষ্টি সীমার মাঝে চলে আসে তখন মশাল টি জালিয়ে লাইন থেকে একটি নির্দিষ্ট দুরত্বে বিশেষ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে মশাল নাড়াতে থাকে। আর ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে মাথা বের করে একজন সেটি খেয়াল করে হাত বের করে থাকে। ট্রেন টি কাছে আসলে সিগ্নাল ম্যান আর এক হাতে গোলোক টি উচিয়ে ধরে। দ্রুত ট্রেন চলে যাওয়ার সময় ট্রেন থেকে বের করে থাকা হাতের ভেতর এই গোলোক টি ঢুকে যায়। প্রক্রিয়াটি খুবই বিপদ জনক।
একসময় এ স্টেশনে তিন নম্বর চার নম্বর লাইন পর্যন্ত ছিল। এখন সেগুলো শুধু যুদ্ধ বিদ্ধস্ত কোন স্টেশন এর মত এখানে ওখানে উকি দেয়। সিগ্নাল গুলো নিয়মিত রঙ করা হয় যদিও তার কোন কাজ নেই। এখন শুধু দুটি লাইন। একটি মেইন লাইন আর এক টি সাব লাইন। মেইন লাইন দিয়ে ট্রেন সাধারনত যাওয়া আসা করে, আর যদি কোন ট্রেন এর সাথে ক্রস ইন থাকে তবে প্রথম যে ট্রেন টি আসে সেটি এ সাব লাইনে অপেক্ষা করতে থাকে। মেইন লাইন থেকে সাব লাইনে ট্রেন কে নিতে একটা পুলি কে টেনে সাব লাইন এর লাইন টি মেইন লাইনের সাথে মিলিয়ে দেয়া হয়। এতে ট্রেন ঐ দিকদিয়ে আসার সময় মেইন লাইনে না গিয়ে সাব লাইনে প্রবেশ করে। সাব লাইন কে সাধারনত দুই নম্বর লাইন বলা হয়, আর মেইন লাইন কে এক নম্বর। এখানে ক্রস ইনের ব্যাপার টা “পরে এসে আগে যায় ধরনের”। আগে যে ট্রেন টি আসে সেটি অপেক্ষা করতে থাকে, আর পরে যেটি আসে সেটি আগে চলে যায়।
সিগ্নাল ঘরটি স্টেশন ঘর এর পাশেই। টাওয়ার এর মত বেশ উঁচু ঘর। এর উত্তর দক্ষিন এর জানালা দিয়ে দুই পাশের আউট সিগ্নাল পর্যন্ত দেখা যায়। শীতের সময় ঘন কুয়াশায় কি করে দেখে সেটা একটা রহস্য। এখানে অনেক গুলো পুলি বন্দুকের মত পাশাপাশি সাজানো। তাদের নিচ দিয়ে অনেক গুলো তার বিভিন্ন গাইড হয়ে নির্দিষ্ট সিগ্নাল পর্যন্ত চলে গেছে। পুলিটি টানলে সিগ্নাল এর হাতা টা উপর এর দিকে উঠে যায়। আর হাতায় লাগানো সবুজ হলুদ বা লাল রঙ নির্দেশ করে। রাতে সিগ্নালের নির্দিষ্ট যায়গায় কেরোশিনের প্রদিপ ঢুকিয়ে দেয়া হয়। সেই আলোয় নির্দিষ্ট রঙ এর ঘর সামনে এসে তা নির্দেশ করে।
রাতে এর ১০০ ওয়াটের হলুদাভ লাইট গুলো পুরো স্টেশন কে এক রহস্যময় স্থান করে ফেলে। সেই আলোয় অনেক কিছুই ঘটে যায়। রহস্য শুধু রহস্য থাকে না তা ডালপালা ছড়াতে ছড়াতে স্টেশন এর পেছনের নাম না জানা প্রায় আকাশ ছোয়া গাছ দুটির মত হয়ে যায়। কে লাগিয়েছিল গাছ গুলো সেটা কেউ বলতে পারে না। আম কাঠাল বা বট গাছ বাংলাদশে র এখানে সেখানে দেখলে তেমন কিছু মনে হয় না কিন্তু এ গাছটি সহজেই চোখে পরে। কান্ড টি অনেক উঁচু। আর ডাল পালা সব যেন বিশাল এক ছাদ তৈরি করেছে। পাতা গুলো তেতুল পাতার মত কিছুটা কিন্তু তাদের অ্যারেঞ্জমেন্ট টা শিশু গাছের পাতার মত। এর উপরের দিকে তাকালেই কেমন যেন বুকের মাঝে ফাকা ফাকা একটা অনুভূতি হতে থাকে। নিহসঙ্গতার অনুভুতি। রাতে রহস্যময় হলুদ আলোর সাথে হাল্কা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা গাছ যেন সব রহস্য কে ঘনিভুত করে দেয়।
প্লাটফর্ম আসলে নামেই, প্লাটফর্ম বলতে যা বুঝায় তা নেই এ স্টেশনে। চার দিকে উন্নয়নের জয় জয় কারে কেন প্লাটফর্ম নেই তা কেউ জানে না। স্টেশনের উত্তর পাশে দুট বস্তা নিয়ে জাম গাছের নিচে বসে ছিল এক বুড়ি। একটু কুঁজো হয়ে গেছে তবে একসময় বেশ লম্বা ছিল বোঝা যায়। গায়ে জড়ান কালো পারের নীল মোটা কাপড়ের এক টা শাড়ি। সে নীলও রোদ জ্বলা হয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। সাধারনত এগুলো মানুষ এখন জাকাতের শাড়ি হিসেবে দেয়। বুড়ির শুকনো শরীরেও সে শাড়ি ঠিক মত হয় নি, তাই বার বার আচল টেনে মাথার কাছে নিয়ে আসলেও তা থাকছে না। পায়ের দিকে উঁচু করে পরা না শাড়ির ঘের ছোট তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। মুখটি লম্বাটে, উঁচু নাক, মুখের চামরা গুলো যেন অসঙ্খ্য ভাজ হয়ে মুখে র সাথে বসে যেতে চাইছে। চোখের পাতা দুটি পানিতে ভেজা মাঝে মাঝে শাড়ির আচল দিয়ে সেটা মুছছে। কাঁদছে না, চালসে ধরেছে চোখে তাই পানি পরে। হয়ত কম দেখে চোখে কিন্তু মনে হয় সে এ কম দৃষ্টিতেই অভিযোজিত হয়ে গেছে। এ বয়সেও যাকে বোঝা টানতে হচ্ছে, তার চোখে কান্নার অশ্রু না চালসের অশ্রু তা বোঝার আর কি দরকার?
যে নিজেই প্রায় অচল তার সাথে এ দুট বস্তা কেন তা ভাবার বিষয়। টানতে টানতে বস্তা দুটি কে টেনের কামরার সামনে আনতে পেরেছে কোন মত। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলছে “ ও বাবা বস্তা ডা অ্যানা তুলে দেও বাবা”। দরজায় কেউ নেই। একজন বাদাম ওয়ালা শুধু তাড়াহুড়ো করে নেমে আর এক বগির দিকে এগিয়ে গেল। বুড়ি ডেকেই যাচ্ছে। দরজার পাশের সিট টাতে এক জন পা তুলে ঘুমাচ্ছিল। বুড়ির হাক শুনে না গরমে একবার জানালা দিয়ে মাথা বের করে তাকিয়ে আবার সরিয়ে নিল। কুলি দুটি বুড়ির প্রায় কাছে আসতেই তার হাক শুনতে পেল। তখনই ট্রেন ছাড়ার জন্য গার্ড এর হুইসেল শোনা গেল। কুলি টি কাছে গিয়ে বলল, “ কেডা জলিলের মাও না”? বুড়ি সে উত্তর না দিয়ে ব্যাকুল হয়ে শুধু বলল “ হামার বস্তা ডা তুলে দেও বাবা”। এক কুলি তাকে জিজ্ঞেস করার সময় আর একজন একটা বস্তা তুলে দিয়েছে। বুড়ির হাত ধরে কোনমত তারা তাকে বগির ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। এরপর আর একটি বস্তা টা তুলে দেয় বুড়ির পাশে। এগুলো করার সময় বলতে থাকে “তোমাক এগ্লা টানবের বায়না কেডা দিছে? নিজেই অচল তার সাথে বোচকা বাচকি”।বুড়ি বলে সাধে কি হামি এগ্লা টানি রে? আল্লাহক কই মরন দেও, তাও ত দেয় না”। ততক্ষনে ট্রেন চলতে শুরু করেছে। বুড়ি বস্তা টা ধরে কুলি দুটিকে দেখার চেষ্টা করতে থাকে আর বলতে থাকে “আল্লাহ তোগেরে ভালো করবি বাবা”। কুলি দুটি হাত ঝারতে ঝারতে বলে “বুড়ির এক পাও কব্বরে ঢুকে আছে তাও বুড়ি বস্তা টানা ছাড়ে না”। আর এক জন একটু আক্ষেপ করে বলে “কি করবি ক, এডা ব্যাটা তাও পাগলা। কুটি থাকে না থাকে ঠিক নাই। বুড়িক আর কেডা দেখবি”?
ট্রেন টি চলে যাওয়ার সাথে সাথে নিস্তব্ধতা নেমে আসে স্টেশনে। পশ্চিম দিকে মুখ করা স্টেশন এর লাল ইট এর দালান। তার পাশেই শক্ত মোটা টিনের বেশ উঁচু একটা সেড। সেখানে যাত্রীদের বসার যায়গা, এক কোনায় পান সিগারেট এর একটি দোকান। প্লাটফর্ম এর সাথেই একটি চা স্টল। স্টলটির পেছনের দিকে একটি উঁচু ঘটের চুলোয় বড় বড় তিনটি কেটলি চরান। একটি তে পানি ফুটছে আর একটি তে চা পাতা। শেষের টি তে দুধ। দুধ জাল হতে হতে ঘন লাল হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে সেখান থেকে স্বর তুলে ছোট ছোট গ্লাসে ভরে রাখে দোকানি ইসমাইল মিয়াঁ। আর দোকানে কাঠের সরু টেবিল কে ঘিরে অনেক গুলো কাঁচের কৌটো, তাতে না না পদের বিস্কিট, কেক রাখা। পাশে দাড় করান প্লাস্টিকের কেসে কিছু কোমল পানীয়।
স্টেশন ঘরে একটি মাত্র কামরা, ভেতরে একটি টয়লেট আছে। নোনা ধরা সাদা দেয়ালের এক পাশে অনেক উঁচুতে একটি বড় গোল দেয়াল ঘড়ি ঝুলান, আর নিচে সারি করা অনেক গুলো ক্যালেন্ডার। সব গুলিতেই ট্রেন এর ছবি। পুরোন ক্যালেন্ডার গুলি সরান কেন হয় নি কে জানে? ঘরটিতে বড় একটি টেবিল পাতা। টেবিল এর বয়স কত তা একটা গবেষনার বিষয় হতে পারে। শক্ত কাল কাঠের তৈরি। টেবিলে দুটি কালো রঙ এর টেলিফোন সেট। তার একদিকে দুটি কাঠের চেয়ার। টেবিলের উপর বড় একটি খাতা। এতে ট্রেন আসা যাওয়া আর নির্দিষ্ট পন্য ওঠানামার রেকর্ড করা হয়। চেয়ার এর পেছনে জানালা ঘেঁষে একটি আলমারি। টিকেট রাখার জন্য বিশষ ভাবে তৈরি। পাল্লা দুটি খুললে ভেতর থেকে অসঙ্খ্য খোপ খোপ টিকিট রাখার যায়গা গুলো উকি দেয়।
দেড় ইঞ্চি বাই দুই ইঞ্চি আকৃতির মোটা কাগজের টিকেট। কোন টির রঙ ফ্যাসফেসে হলুদ কোনটি বা জ্বলে যাওয়া লাল। এর উপর বাংলাদেশ রেল ওয়ের মনোগ্রাম সহ আরো কিছু লেখা থাকে। কোন স্টেশন থেকে কোন স্টেশন যাবে তা, দূরত্ব এই সব। পিছনে লেখা থাকে কোন একটি জন সচেতনতা মূলক স্লোগান। যেমন “ছেলে হোক মেয়ে হোক দুটি সন্তানি যথেষ্ট” এ রকম আরো কিছু। টিকেট টি একটি লোহার অদ্ভুত যন্ত্রের মাঝে ঢুকিয়ে দিলে কটাস করে একটি ধাতব শব্দ হয়। আর এতে ঐ দিনের তারিখ টিকেটে লেগে যায়। ”আরো খবর জানতে “
এর পাশেই একটি ওজন যন্ত্র। কোন এক সময় হয়ত পন্য ওজন ওজন করা হত। এর বিশাল ওজন নির্দেশক গোলক টি র কাটা কত বছর ধরে ১০০ পাউন্ড এ থেমে আছে তা কেউ বলতে পারে না। ব্রিটিশ রা রেল চালু করেছিল এ উপমহাদেশে, তাই বোধ হয় ওদের একক ব্যাবহার করেছে। এর পাশে লোহার বাক্সের মত একটি অদ্ভুত যন্ত্র। যখন কোন ট্রেনের খবর হয় তখন তার দিকের সাথে মিলিয়ে এই যন্ত্রের সেই পাশের হ্যান্ডেল টিতে চাপ দিয়ে ঘুরিয়ে দেয়। ভেতরে হাতুরি পেটার মত শব্দ করে এক টি পিতলের চাকতি বেরিয়ে আসে। সেখানে ট্রেন এর পরিচিতি নির্দেশক কিছু একটা থাকে। সেটা কে একটা গোলাকার প্রায় দেড় ফুট ব্যাসার্ধের একটি গোলকে র সাথে ভাল করে জরিয়ে দেয়া হয়। ট্রেন আসলে সেটা কে ট্রেন এর গার্ড এর কাছে দেয়া হয় আর গার্ড এর কাছ থেকে অন্য স্টেশনে দেয়া গোলকটি নেয়া হয়। ছোট্ট স্টেশনে এক্সপ্রেস ট্রেন গুলি থামে না। সেগুলি কে এ চাকতি দেয়া হয় একটি বিশেষ উপায়ে। সিগ্নাল ম্যান স্টেশন এর আউট সিগ্নালের কাছাকাছি গিয়ে একটি লোহার বড় তারের মাথায় কাপড় পেচিয়ে কেরসিন ঢেলে আগুনের মশাল তৈরি করে। ট্রেন যখন দৃষ্টি সীমার মাঝে চলে আসে তখন মশাল টি জালিয়ে লাইন থেকে একটি নির্দিষ্ট দুরত্বে বিশেষ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে মশাল নাড়াতে থাকে। আর ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে মাথা বের করে একজন সেটি খেয়াল করে হাত বের করে থাকে। ট্রেন টি কাছে আসলে সিগ্নাল ম্যান আর এক হাতে গোলোক টি উচিয়ে ধরে। দ্রুত ট্রেন চলে যাওয়ার সময় ট্রেন থেকে বের করে থাকা হাতের ভেতর এই গোলোক টি ঢুকে যায়। প্রক্রিয়াটি খুবই বিপদ জনক।
একসময় এ স্টেশনে তিন নম্বর চার নম্বর লাইন পর্যন্ত ছিল। এখন সেগুলো শুধু যুদ্ধ বিদ্ধস্ত কোন স্টেশন এর মত এখানে ওখানে উকি দেয়। সিগ্নাল গুলো নিয়মিত রঙ করা হয় যদিও তার কোন কাজ নেই। এখন শুধু দুটি লাইন। একটি মেইন লাইন আর এক টি সাব লাইন। মেইন লাইন দিয়ে ট্রেন সাধারনত যাওয়া আসা করে, আর যদি কোন ট্রেন এর সাথে ক্রস ইন থাকে তবে প্রথম যে ট্রেন টি আসে সেটি এ সাব লাইনে অপেক্ষা করতে থাকে। মেইন লাইন থেকে সাব লাইনে ট্রেন কে নিতে একটা পুলি কে টেনে সাব লাইন এর লাইন টি মেইন লাইনের সাথে মিলিয়ে দেয়া হয়। এতে ট্রেন ঐ দিকদিয়ে আসার সময় মেইন লাইনে না গিয়ে সাব লাইনে প্রবেশ করে। সাব লাইন কে সাধারনত দুই নম্বর লাইন বলা হয়, আর মেইন লাইন কে এক নম্বর। এখানে ক্রস ইনের ব্যাপার টা “পরে এসে আগে যায় ধরনের”। আগে যে ট্রেন টি আসে সেটি অপেক্ষা করতে থাকে, আর পরে যেটি আসে সেটি আগে চলে যায়।
সিগ্নাল ঘরটি স্টেশন ঘর এর পাশেই। টাওয়ার এর মত বেশ উঁচু ঘর। এর উত্তর দক্ষিন এর জানালা দিয়ে দুই পাশের আউট সিগ্নাল পর্যন্ত দেখা যায়। শীতের সময় ঘন কুয়াশায় কি করে দেখে সেটা একটা রহস্য। এখানে অনেক গুলো পুলি বন্দুকের মত পাশাপাশি সাজানো। তাদের নিচ দিয়ে অনেক গুলো তার বিভিন্ন গাইড হয়ে নির্দিষ্ট সিগ্নাল পর্যন্ত চলে গেছে। পুলিটি টানলে সিগ্নাল এর হাতা টা উপর এর দিকে উঠে যায়। আর হাতায় লাগানো সবুজ হলুদ বা লাল রঙ নির্দেশ করে। রাতে সিগ্নালের নির্দিষ্ট যায়গায় কেরোশিনের প্রদিপ ঢুকিয়ে দেয়া হয়। সেই আলোয় নির্দিষ্ট রঙ এর ঘর সামনে এসে তা নির্দেশ করে।
রাতে এর ১০০ ওয়াটের হলুদাভ লাইট গুলো পুরো স্টেশন কে এক রহস্যময় স্থান করে ফেলে। সেই আলোয় অনেক কিছুই ঘটে যায়। রহস্য শুধু রহস্য থাকে না তা ডালপালা ছড়াতে ছড়াতে স্টেশন এর পেছনের নাম না জানা প্রায় আকাশ ছোয়া গাছ দুটির মত হয়ে যায়। কে লাগিয়েছিল গাছ গুলো সেটা কেউ বলতে পারে না। আম কাঠাল বা বট গাছ বাংলাদশে র এখানে সেখানে দেখলে তেমন কিছু মনে হয় না কিন্তু এ গাছটি সহজেই চোখে পরে। কান্ড টি অনেক উঁচু। আর ডাল পালা সব যেন বিশাল এক ছাদ তৈরি করেছে। পাতা গুলো তেতুল পাতার মত কিছুটা কিন্তু তাদের অ্যারেঞ্জমেন্ট টা শিশু গাছের পাতার মত। এর উপরের দিকে তাকালেই কেমন যেন বুকের মাঝে ফাকা ফাকা একটা অনুভূতি হতে থাকে। নিহসঙ্গতার অনুভুতি। রাতে রহস্যময় হলুদ আলোর সাথে হাল্কা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা গাছ যেন সব রহস্য কে ঘনিভুত করে দেয়।
No comments:
Post a Comment